আমেরিকার অবস্থা প্যাথেটিক -Partha Banerjee

আমেরিকার অবস্থা যে কতটা প্যাথেটিক, সেটা আমেরিকায় যারা বহুকাল বসবাস করেনি, বা বসবাস করেও রাজনীতি অর্থনীতি সমাজনীতির জগতে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেনি, তারা বুঝতে পারবেনা। আমেরিকানরাও মোটেই শুনতে রাজি নয় যে দেশটা খুবই পিছিয়ে পড়া। তারা বহুকাল ধরে একটা ধারণা বদ্ধমুলভাবে ধরে রেখেছে যে এই দেশটা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দেশ। কীসে শ্রেষ্ঠ, জিজ্ঞেস করলে তারা বলবে, শ্রেষ্ঠ ধনী দেশ। বলবে, শ্রেষ্ঠ স্বাধীনতার দেশ। বলবে, শ্রেষ্ঠ মুক্তচিন্তার দেশ। বলবে, শ্রেষ্ঠ ডাইভারসিটির দেশ, যেখানে সারা পৃথিবীর জাতি, বর্ণ, ধর্ম সব বিউটিফুলভাবে শান্তিতে বসবাস করছে। এবং বলবে, তুমি বলবার কে? তুমি নিজেই তো ইন্ডিয়া থেকে এদেশে চলে এসেছো। যদি শ্রেষ্ঠ দেশ না হতো, তাহলে কি তুমি আসতে? বা, থেকে যেতে সারা জীবন?

এই সব ধারণা নিয়ে বেশিরভাগ আমেরিকান বেঁচে আছে। “দা আমেরিকান ড্রিম।” যা বহুকাল আগেই অদৃশ্য হয়ে গেছে। আর, ভারত বা বাংলাদেশেও বেশির ভাগ মানুষের তাই ধারণা। আমেরিকা মানেই শ্রেষ্ঠ। তার ওপর স্পোর্টসের জগতে তাদের এথলিটরা অনেক সোনার মেডেল পায়, আর নোবেল প্রাইজ পায় মার্কিন বিজ্ঞানীরা প্রতি বছর, সুতরাং মিডিয়ার কল্যাণে আমরা ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে প্রশ্নাতীত ভাবে আমেরিকা পৃথিবীর সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দেশ।

Partha 2

এই অবস্থায় আমি যখন আমার আমেরিকান ছাত্রছাত্রীদের চ্যালেঞ্জ করি, এবং অন্য সব তথ্য তাদের সামনে হাজির করি, তাদের প্রতিক্রিয়া হয় বিভিন্ন ধরণের। (১) কিছু মানুষ ভাবে আমি আমেরিকা-বিদ্বেষী (ঠিক যেমন ভারত সম্পর্কে ঝুলির বেড়াল বের করে দিলেই অনেকে আমাকে ভারতবিদ্বেষী তকমা দিয়ে দেয়।) (২) স্কেপ্টিসিজম বা সন্দেহ জাগে অনেকের মনে — কেন আমি এসব কথা প্রকাশ্যে আলোচনা করছি (যেন প্রকাশ্যে সত্য উদঘাটন একটি অপরাধ বা অনৈতিক, বিশ্বাসহীনতার কাজ।) (৩) অনেকের সব কিছু শুনেও এই ধারণা থেকে যায় যে এসবকিছুর পরেও আমেরিকাই শ্রেষ্ঠ, কারণ নইলে সারা পৃথিবী থেকে আমেরিকায় লোক পিলপিল করে আসবে কেন। খুব কম সংখ্যক ছাত্রছাত্রীই বুঝতে চেষ্টা করে, কেন ব্রেনওয়াশিং’এর হাত থেকে আমাদের মগজকে উদ্ধার করা একেবারে অবশ্যকর্তব্য, এবং শুধুমাত্র নির্ভেজাল, সত্যভিত্তিক তথ্য ও তার কারণ অনুসন্ধানই পারে আমেরিকা ও সেই সঙ্গে সারা পৃথিবীর সাধারণ মানুষকে ওয়ান পার্সেন্টের এই ভয়াবহ মিলিটারি, মিডিয়া ও অর্থনৈতিক আক্রমণ, আগ্রাসন, ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করতে।

আমিও অন্য স্ট্র্যাটেজি নিয়েছি। আমি আজকাল আমার স্টুডেন্টদের বলি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তাদের রিসার্চ তাদেরই করতে, এবং আমার কথা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস করতে। এতে কাজ হয় অনেক বেশি। আমেরিকার ভয়ঙ্কর মিলিটারি ও যুদ্ধ আগ্রাসন ও বাজেট, আমেরিকার প্রাইভেট প্রিজন ইন্ডাস্ট্রি, আমেরিকার চরমতম অর্থনৈতিক মেরুকরণ ও দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রিমিটিভ অবস্থা, বন্দুকবাজি, পুলিশি অত্যাচার, এখনকার ইমিগ্রেন্টদের এদেশে আসার কারণ ও তাদের ওপর নিপীড়ন, এবং ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্বব্যাপী ঐতিহাসিক লুন্ঠন ও দুর্নীতি — এই বিষয়গুলি নিয়ে তারা যখন রিসার্চ করে, তখন তাদের মুখের অবস্থা একেবারে বদলে যায়।

তিরিশ, চল্লিশ বা পঞ্চাশ বছর বয়েসী পোড়খাওয়া পুরুষ ও মহিলা শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মী — ক্লাসের শুরুতে তাদের প্রতিক্রিয়া এক রকম থাকে, আর ক্লাসের শেষে হয়ে যায় একেবারে অন্যরকম।

অনেকে কাছে এসে বারবার ধন্যবাদ দিয়ে যায় এই নতুন জ্ঞান অর্জন করতে তাদের সাহায্য করার জন্যে। অনেকে বলে, আমার ক্লাস তাদের চোখ খুলে দিয়েছে।

আমি ভগবানে তেমন বিশ্বাস করিনা। কিন্তু বিশ্বাস করি, কোনো এক বিধাতা আজ আমাকে জীবনের এই ইন্টেলেকচুয়াল ও স্পিরিচুয়াল পরিতৃপ্তির জায়গায় পৌঁছে দিয়েছেন। কিছু তো একটা করে গেলাম এই ক্ষুদ্র জীবনে! সে যতই সামান্য হোক না কেন।

Leave a comment