সারাদেশে মৌলিক সমাজ পরিবর্তনের পদধ্বনি – বদরুদ্দীন উমর

১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার ১৯৭২-৭৩ সালে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল, সেটা না হওয়ায় চল্লিশ বছর পর ঢাকার শাহবাগ চত্বর থেকে নিয়ে সারাদেশে এখন যুদ্ধাপরাধীদের যথাযথ বিচার ও শাস্তির দাবি ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এখনকার মতো এত ব্যাপক না হলেও এই ইস্যুতে ১৯৯২ সালে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে এক শক্তিশালী আন্দোলন হয়েছিল।

অনেক ধরনের বেইমানির কারণে ১৯৯২ সালে শুরু হওয়া আন্দোলন জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পর আর অগ্রসর হয়নি। আওয়ামী লীগের জামায়াতে ইসলামির সঙ্গে চক্রান্তমূলকভাবে আঁতাত করাই ছিল তার মূল কারণ। সেই আঁতাত ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল আওয়ামী লীগ-জামায়াত সমঝোতায়, যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করেছিল। সমঝোতার অন্যতম শর্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদে জামায়াতকে দিয়েছিল দুটি মহিলা আসন। আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং বর্তমানে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারাধীন জামায়াতের তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামীর মধ্যে ধারাবাহিকভাবে অনেক বৈঠকের মাধ্যমেই এ দুই দলের মধ্যে সমঝোতা স্থাপিত হয়। এর শর্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগ শুধু জামায়াতকে দুটি মহিলা আসনই দেয়নি, একটানা পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকলেও তারা ১৯৯২ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ধারে কাছে না গিয়ে জামায়াতে ইসলামির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছিল। এসব কোন বিতর্কের ব্যাপার নয়। এটা এদেশে কোন অপরিচিত ব্যাপার নয়।

অনেকে বলছেন, পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও হচ্ছে যে স্বাধীন বাংলাদেশে চল্লিশ বছর পর এখন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আবার আন্দোলন হচ্ছে। কিন্তু কেন এতদিন এ বিচার হয়নি, এ বিষয়ে কোন কথাবার্তা ও আলোচনা কোথাও দেখা বা শোনা যাচ্ছে না। এটা বর্তমান আন্দোলনের একটা দুর্বলতার দিক। এর কারণ ঠিকমতো না বুঝলে আন্দোলন আবার নতুন করে বিপথগামী হওয়ার ষোলআনা সম্ভাবনা। এজন্য একাত্তরের ঠিক পরবর্তী সময়ে কি ঘটেছিল সেটা দেখা দরকার।

১৯৭২ সালের জুলাই মাসে শিমলায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি চুক্তি হয়, যার মাধ্যমে এ দুই দেশের সরকার পারস্পরিক নানা সমস্যার সমাধান এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি নির্ধারণ করে। বলাই বাহুল্য, ‘শিমলা চুক্তি’ নামে পরিচিত এই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবের পর ও তার পরিপ্রেক্ষিতে। এই চুক্তির ধারাবাহিকতায় ১৭ এপ্রিল ১৯৭৩, ভারত ও বাংলাদেশ এক যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে বলে, তারা উপমহাদেশে (অর্থাৎ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে) উত্তেজনা প্রশমিত ও পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে বলা হয় যে মানবিক কারণে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে অন্য দেশের আটকেপড়া নাগরিকদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা হবে, তবে যেসব পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিকে আটক রাখা হয়েছে তারা এর আওতার বাইরে থাকবে, কারণ বিচারের জন্য তাদের বাংলাদেশের প্রয়োজন হতে পারে।
এই ঘোষণার পর ভারত ও বাংলাদেশ এবং ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অনেকগুলো বৈঠক হয়। এসব বৈঠকের শেষে ২৮ আগস্ট ১৯৭৩ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি চুক্তি হয়, যার ফলে বাংলাদেশ ঐকমত্য পোষণ করে। এই চুক্তি অনুযায়ী সব মানবিক সমস্যার সমাধানের ব্যবস্থা করা হয়।

চুক্তির পর ১৯৭৪ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। এই স্বীকৃতির পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বৈঠকের ব্যবস্থা হয়।
(চলবে)
প্রথম প্রকাশ: দৈনিক যুগান্তর, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

(By Badruddin Umar, Bangladesh. প্রথম প্রকাশ: দৈনিক যুগান্তর, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩>)

Leave a comment